চীনের জ্বালানি খাতকে নাজুক অবস্থানে ফেলে দিয়েছিল যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের আভাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের আভাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেলআবিব এখন তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তার এ ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা গেছে বৈশ্বিক পণ্যবাজার ও পুঁজিবাজারে। এরই মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার। দাম কমেছে বিনিয়োগকারীদের ‘আপৎকালীন আশ্রয়’ স্বর্ণের। প্রশমন হয়ে আসছে বৈশ্বিক জ্বালানি পণ্যের বাজারে বিদ্যমান সরবরাহ সংকটের আশঙ্কাও। গতকাল এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত প্রায় সবক’টি বাজার আদর্শে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে কম বেশি ৪ শতাংশ।

গোটা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের হুমকিতে ফেলে দিয়েছিল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি পণ্য আমদানিকারক দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় উদ্বেগ তৈরি করেছিল। বিশেষ করে বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীনের জ্বালানি খাত বেশ নাজুক অবস্থানে চলে গিয়েছিল বলে অভিমত বাজার পর্যবেক্ষকদের।

রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনই জ্বালানি তেল আমদানি করে সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে ইরান থেকে রফতানীকৃত জ্বালানি তেলের শীর্ষ গন্তব্যও চীন। দেশটির মোট জ্বালানি তেল আমদানির ১৩ দশমিক ৬ শতাংশের জোগান আসে ইরান থেকে। ইরানের সমুদ্রপথে রফতানীকৃত জ্বালানি তেলের ৯০ শতাংশই যায় চীনে। কেপলার ডাটার হিসাবে চলতি ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ইরান থেকে দিনে গড়ে ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল জ্বালানি তেল ক্রয় করেছে চীন। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল দিনে ১৪ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল। সে সময় চীনের মোট জ্বালানি তেল আমদানিতে ইরানের অবদান ছিল ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যমতে, ইরান থেকে জ্বালানিসহ পণ্য আমদানি-রফতানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধ আরোপ রয়েছে। যদিও এ বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই ইরান থেকে জ্বালানি পণ্য আমদানি করছে চীন। বিধিনিষেধের সুবাদে ভেনিজুয়েলা ও রাশিয়ার মতো ইরান থেকেও তুলনামূলক অনেক কম দামে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করছে দেশটির আমদানিকারকরা।

তবে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর পরিবর্তে ‘টি-পট’ হিসেবে পরিচিত স্বায়ত্তশাসিত ও স্বতন্ত্র পরিশোধনাগারগুলো ইরান থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। বিশেষ করে শ্যানডং প্রদেশভিত্তিক পরিশোধনাগারগুলো ইরানি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ব্যবহার করে বেশি।

চীনের মোট জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতায় এ ধরনের টি-পট কোম্পানির হিস্যা প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অনেক ক্ষেত্রেই এসব কোম্পানির মুনাফার মার্জিন থাকে খুবই সামান্য। কখনো কখনো তা ঋণাত্মক হারেও নেমে আসে। চীনের স্থানীয় বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের পড়তি চাহিদা কোম্পানিগুলোর মুনাফার সক্ষমতাকে চাপে ফেলেছে। এ অবস্থায় ইরান, রাশিয়া ও ভেনিজুয়েলার মতো পশ্চিমা বিধিনিষেধের আওতায় থাকা দেশগুলো থেকে কম দামে সংগৃহীত জ্বালানি পণ্যের ওপর এসব কোম্পানির নির্ভরতা আরো বেড়েছে। যদিও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহদায়তনের জ্বালানি কোম্পানিগুলো ২০১৮-২৯ মৌসুম থেকেই ইরানি জ্বালানি তেল আমদানি করা থেকে বিরত রয়েছে।

রয়টার্সের হিসাবে, ইরান থেকে জুলাইয়ে সরবরাহের চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ইরানিয়ান লাইট ক্রুড) আমদানিতে খরচ পড়ে ব্রেন্টের তুলনায় ৩ ডলার ৩০ থেকে ৩ ডলার ৫০ সেন্ট কম। তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বর্তমানে ইরানি জ্বালানি তেল বিধিনিষেধের আওতামুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে সরবরাহকৃত পণ্যের তুলনায় ব্যারেলে ৭-৮ ডলার কম মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।

ওবামা প্রশাসনের আমলে এ বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার পর ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন তেহরানের ওপর পুনরায় তা আরোপ করে ২০১৮ সালে। এরপর গত জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইরানি জ্বালানি তেল বাণিজ্যের ওপর বিধিনিষেধের ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণ করেন।

তবে বেইজিংয়ের ভাষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের এসব বিধিনিষেধ একতরফা। ইরানের সঙ্গে বৈধভাবেই জ্বালানি বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছেন চীনের আমদানিকারকরা।

যদিও চীনের সরকারি তথ্যে ইরান থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেলের উৎস দেশ হিসেবে দেখানো হয় মালয়েশিয়ার মতো ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে পরিচিত অন্য কোনো দেশকে। আবার চীনা কাস্টমসের পরিসংখ্যানেও ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর ইরান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জ্বালানি তেল আমদানির তথ্য উল্লেখ করা নেই।

আরও